Menu

কবি দণ্ডী, দশকুমারচরিত রচয়িতা

কবি দণ্ডী : সংস্কৃত সাহিত্যের ইতিহাসে গদ্যকাব্য রচয়িতা হিসেবে দণ্ডী উল্লেখযোগ্য একজন কবি। তাঁর সময়কাল ও কাব্য পরিচয় এখানে বিধৃত হলো।

কবি দণ্ডী, দশকুমারচরিত রচয়িতা


কবি দণ্ডীর সময়কাল

কাব্যলক্ষণাক্রান্ত সংস্কৃত গদ্যকাব্যের ইতিহাসে দণ্ডী, সুবন্ধু এবং বাণভট্টই অবিস্মরণীয় কীর্তির অধিকারী। দণ্ডীর ‘দশকুমারচরিত’ একটি বিশিষ্ট গদ্যকাব্য। খ্রীষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীর প্রারম্ভের সামান্য পূর্ববর্তী সময়কে দণ্ডীর আবির্ভাব কাল বলে মনে করা হয়। তিনি কাঞ্চীর অধিবাসী ছিলেন এবং কাঞ্চীরাজ নরসিংহবর্মার রাজসভায় উচ্চপদে আসীন ছিলেন।

কবি দণ্ডীর রচনাসমূহ

“ত্রয়ো দণ্ডিপ্রবন্ধাশ্চ ত্রিষু লোকেষু বিশ্রুতাঃ” —রাজশেখরের এই উক্তি থেকে জানা যায় যে দণ্ডী তিনটি গ্রন্থের প্রণেতা। ‘দশকুমারচরিত’ নামক গদ্যকাব্য, এবং ‘কাব্যাদর্শ’ নামক অলংকার গ্রন্থ দণ্ডীর রচনা। কেউ কেউ ‘ছন্দোবিচিতি’-কে, আবার কেউ কেউ ‘অবন্তিসুন্দরী-কথা’-কে দণ্ডীর তৃতীয় রচনা বলে মনে করেন। অবন্তিসুন্দরীকথাসার’ গ্রন্থের বিবরণ অনুসারে দণ্ডী বাল্যকালে পিতৃমাতৃহীন হলে সরস্বতী ও শ্রুতের দ্বারা পালিত হন।

আরো পড়ুন--  সংস্কৃত গদ্যকাব্য, Prose Romance

সংস্কৃত সাহিত্যের দুইজন দণ্ডী

দশকুমারচরিতের রচয়িতা দণ্ডী এবং কাব্যাদর্শ প্রণেতা দণ্ডী একই ব্যক্তি কিনা এ সম্পর্কে পণ্ডিতদের মধ্যে মতানৈক্য আছে। কাব্যাদর্শে দণ্ডী কাব্যের যে আদর্শ প্রতিষ্ঠিত করেছেন, দশকুমারচরিতের বহুস্থলে সেই আদর্শ লঙ্ঘিত হয়েছে। আবার অনেকে মনে করেন যে, দশকুমারচরিত কবির তরুণ বয়সের রচনা এবং কাব্যাদর্শ পরিণত বয়সের রচনা বলে উভয়ের মধ্যে আদর্শগত ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। সমালোচক A. B. Keith-এর কথায়, “… it is perfectly possible and even probable that the romance came from the youth and the Kavyadarsa from his more mature judgement …” (AB Keith, A History of Sanskrit Literature)

কবি দণ্ডীর দশকুমারচরিত পরিচয়

দণ্ডীর প্রসিদ্ধ গদ্যকাব্য “দশকুমারচরিত” আখ্যায়িকা শ্রেণীর রচনা। গ্রন্থটি দুটি অংশে বিভক্ত—পূর্বপীঠিকা ও উত্তরপীঠিকা। পূর্বপীঠিকায় আছে পাঁচটি উচ্ছ্বাস এবং উত্তরপীঠিকায় আছে আটটি উচ্ছ্বাস। গ্রন্থটির প্রারম্ভ ও শেষ দুই-ই অসংলগ্ন। সম্ভবতঃ দণ্ডী “দশকুমারচরিত” গ্রন্থটি সমাপ্ত করে যেতে পারেন নি, অথবা তাঁর রচনার কিয়দংশ নষ্ট হওয়ায় পরবর্তীকালে সেই অংশ অপরের দ্বারা রচিত হয়েছে। ‘দশকুমারচরিত’ নামানুসারে এই গদ্যকাব্যে দশজন কুমারের বৃত্তান্ত অপেক্ষিত ছিল। কিন্তু প্রথম আটটি উচ্ছ্বাসে আটজন কুমারের বৃত্তান্ত বর্ণিত হয়েছে। এই অসম্পূর্ণতা দূর করার জন্য পরবর্তীকালে পূর্ব পীঠিকা এবং উত্তরপীঠিকা নামক দুটি অংশ মূল গ্রন্থের সঙ্গে যুক্ত হয়।

আরো পড়ুন--  কবি সুবন্ধু

মগধের রাজা রাজহংস মালবরাজ মানসারের কাছে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে পত্নী বসুমতী সহ বিন্ধ্যপর্বতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। সেখানে রাজার একটি পুত্র জন্মায়। তার নাম রাজবাহন। আরও নয়জন মন্ত্রিপুত্র ঘটনাক্রমে সেখানে উপস্থিত হন। কুমারেরা বয়ঃপ্রাপ্ত ও বিভিন্ন বিদ্যায় পারদর্শী হওয়ার পর ঋষি বামদেবের পরামর্শে রাজহংস তাঁদের দিগ্বিজয় যাত্রার অনুমতি দেন। কুমারেরা দেশভ্রমণে বেরিয়ে বিন্ধ্যারণ্যে এসে উপস্থিত হন। সেখানে ব্রাহ্মণবেশী কিরাত মাতঙ্গের সঙ্গে রাজবাহনের সাক্ষাত হয়। পাতালকন্যা কালিন্দীর সঙ্গে মাতঙ্গের বিবাহে সাহায্য করার জন্য সকলের অলক্ষ্যে রাজবাহন প্রস্থান করেন। অপরাপর কুমারগণ রাজকুমারের অন্বেষণে বেরিয়ে পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। ঘটনাচক্রে তাঁরা আবার একত্রে মিলিত হন এবং নিজ নিজ অভিজ্ঞতার কাহিনী ব্যক্ত করেন। ‘দশকুমারচরিত’ এই দশজন কুমারের অভিজ্ঞতালব্ধ বিচিত্র কাহিনীর রমণীয় আলেখ্যমালা।

কবি দণ্ডীর দশকুমারচরিত কাব্যের বিশেষত্ব

দশকুমারচরিত বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। তৎকালীন সমাজের নৈতিক অবনতি কবি অকপটে ব্যক্ত করেছেন। লোভ, অসাধুতা, প্রতারণা, গুপ্তপ্রণয়, নারীহরণ, চুরি প্রভৃতি সামাজিক কুৎসিত দিকগুলিরও তিনি বাস্তবোচিত চিত্র উপস্থাপিত করেছেন। সাধারণভাবে দণ্ডীর রচনারীতি সহজ ও স্বতঃস্ফূর্ত। গদ্যকাব্যের রীতি অনুযায়ী স্থানে স্থানে গৌড়ী রীতি এবং সমাসবহুল ওজোগুণের সমাবেশ থাকলেও দণ্ডীর রচনা অযথা পাণ্ডিত্যের ভারে ক্লিষ্ট নয়। তাঁর সরল, ললিত এবং সাবলীল বর্ণনার জন্যই এরূপ প্রবাদের উৎপত্তি হয়েছে— “দণ্ডিনঃ পদলালিত্যম্।” ললিতমধুর পদসন্নিবেশ এবং অনুপ্রাস অলংকারের প্রয়োগবাহুল্য বশতঃ কাব্যের গীতিময়তাই পদলালিত্যের মূল।

আরো পড়ুন--  কবি বাণভট্ট, সংস্কৃত সাহিত্যের কবি

দণ্ডীর রচনার চিত্তাকর্ষক কাহিনীতে এই পদলালিত্য অনায়াসলক্ষ্য। বিচিত্র চরিত্রের সমাবেশে ও বাস্তব চিত্র অঙ্কনে দণ্ডী একজন কুশলী কথাশিল্পী। তাই কীথ যথার্থ মন্তব্য করেছেন—”Dandin is unquestionably masterly in his use of language. He is perfectly capable of simple easy narrative, and in the speeches which he gives to his characters he avoids carefully the error of elaboration of language.” (AB Keith, A History of Sanskrit Literature)


সূচীপত্র দেখুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: সংরক্ষিত !!