Menu

কবি বিদ্যাপতি ও ব্রজবুলি ভাষা

Last Update : January 12, 2024

কবি বিদ্যাপতি ও ব্রজবুলি ভাষা

ভূমিকা


বিদ্যাপতির পদাবলীতে ব্যবহৃত কাব্যভাষা সম্পর্কে গবেষণা করতে গিয়ে পণ্ডিতরা স্থির করেছেন যে, বিদ্যাপতির ভাষা ব্রজবুলি। তবে বিদ্যাপতি ব্রজবুলি ভাষায় পদ রচনা করেছিলেন কিনা– এ সম্পর্কে পণ্ডিতেরা স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেননি। অনেকের মতে বিদ্যাপতি মৈথিলী ভাষার মূল পদাবলী রচনা করেছিলেন। পরে তার পদ ব্রজবুলিতে রূপান্তরিত হয়েছে।

বিদ্যাপতি বহু ভাষাবিদ সুপণ্ডিত কবি ছিলেন। সংস্কৃত, অবহট্ট ও মৈথিলী ভাষায় তাঁর রচনা প্রচুর। বাংলা ভাষায় তিনি পদরচনা করেছেন বলে পণ্ডিতেরা মনে করেন না। বিদ্যাপতির ভণিতাযুক্ত দু-একটি যে বাংলা কবিতা পাওয়া যায় তা বিদ্যাপত্তির নামে বাঙালি কবিরই রচনা।

ব্রজবুলি‘ ভাষা বিদ্যাপতির সৃষ্টি নয়। তিনি মাতৃভাষা মৈথিলীতে পদ রচনা করেন। সেগুলি বাংলা, আসাম ও উড়িষ্যায় প্রচলিত হলে তাতে আঞ্চলিক ভাষা প্রবেশ করে। ফলে একটা কৃত্রিম কাব্যভাষা তৈরী হয়। ডঃ সুকুমার সেন লিখেছেন, ষোড়শ শতাব্দীতে আসামে ‘ব্রজবালি’ শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে আধুনিককালে ঈশ্বর গুপ্তই প্রথম ‘ব্রজবুলি’ শব্দটি ব্যবহার করেন। কিন্তু বাংলাদেশে কাব্য রসিকদের মুখে মুখে মধ্যযুগ থেকেই ‘ব্রজবুলি’ শব্দটি প্রচলিত।

কবি বিদ্যাপতি ও ব্রজবুলি ভাষা
ছবির সূত্র : ইন্টারনেট

ব্রজবুলি হল মিশ্রভাষা


মধ্যযুগ থেকেই বাঙালি বিশ্বাস করতেন, বৃন্দাবনের রাধা, কৃষ্ণ ও সখীরা এই ভাষায় কথা বলতেন। তাই এর নাম ‘ব্রজবুলি’ অর্থাৎ ব্রজের বুলি বা ভাষা। বর্তমানে বৃন্দাবনের স্থানীয় জনসাধারণ যে ভাষায় কথা বলেন তার নাম ব্রজবুলি নয় ‘ব্রজভাখা’ বা ‘ব্রজভাষা’। এই ভাষা একটি জীবন্ত লৌকিক ভাষা। এটা পশ্চিমা হিন্দীরই একটি শাখা। কিন্তু ব্রজবুলি কথ্য ভাষা নয়। ব্রজবুলি বৈষ্ণব পদাবলী এবং এই জাতীয় কিছু রচনায় ব্যবহৃত হয়েছে মাত্র। ব্রজবুলিতে কেউ কোনোদিন কথা বলেনি। এই ব্রজবুলির সঙ্গে ব্রজভাখা বা ব্রজভাষার কোনো সাদৃশ্য বা মিল নেই। আসলে ব্রজবুলি একটি কৃত্রিম কাব্যভাষা। ভাষাতাত্ত্বিক বিবর্তনেই এর উদ্ভব ঘটেছে।

ব্রজবুলি ভাষার ভিত্তি মৈথিলী ভাষা। এই মৈথিলী ভাষার জন্ম ‘মাগধী অপভ্ৰংশ’ থেকে। মিথিলা এককালে নব্য ন্যায়শাস্ত্র চর্চার পীঠস্থান ছিল। বাংলাদেশ থেকে অনেক ছাত্র ন্যায়শাস্ত্র শিক্ষার জন্য মিথিলায় যেত। বিদ্যা সমাপনান্তে তাঁরা বিদ্যাপতির পদ মুখে মুখে বহন করে আনত। কালক্রমে বাঙালির মুখে পড়ে সেই মৈথিলী ভাষায় অনেক রূপান্তর ঘটে। বাংলা ভাষার অনুপ্রবেশে মৈথিলী ভাষা কৃত্রিম ব্রজবুলি ভাষায় রূপান্তরিত হয়। মৈথিলী ও বাংলা ভাষার সংমিশ্রণে কৃত্রিম ও মিশ্র ব্রজবুলি ভাষার উৎপত্তি। এভাবে আসামে মৈথিলী ভাষার সঙ্গে অসমীয়া ভাষার সংমিশ্রণে অসমীয়া ব্রজবুলি ভাষার সৃষ্টি। ওড়িয়া ব্রজবুলি সম্পর্কে এই একই কথা।

আরো পড়ুন--  কবি জ্ঞানদাস, 16শ শতকের কবি

বিস্তারিত আলোচনা


ব্রজবুলি ভাষার উৎপত্তির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটটি প্রণিধানযোগ্য। বাংলাদেশ ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দীর মধ্যে মুসলিম তুর্কী শাসনাধিকারে আসে। তুর্কীরা বাংলাদেশে ভয়ঙ্কর আক্রমণ চালিয়ে মঠ, মন্দির ও বিদ্যাচর্চার কেন্দ্রগুলি ধ্বংস করে। নারী ধর্ষণ, লুটতরাজ, অত্যাচার ও গৃহদাহের মধ্য দিয়ে তাদের নির্লজ্জ চণ্ডনীতির ভয়াবহ কাণ্ড-কারখানা চলে। ফলে দেশে বিদ্যা ও সংস্কৃতির চর্চা বেশ কিছুকাল ব্যাহত হয়। মিথিলায় চতুর্দশ শতাব্দীর দ্বিতীয় শতকে তুর্কী আক্রমণ ঘটে।

মিথিলায় তুর্কী আক্রমণে বাংলাদেশের মতো সমাজ ও সংস্কৃতিচর্চার ক্ষতি হয়নি। সেখানে বিদ্যাচর্চাটি নিরুদ্বেগে অব্যাহত ছিল। বাংলা, উড়িষ্যা ও আসাম থেকে ছাত্ররা বিদ্যালাভের জন্য মিথিলায় যেত। বিদ্যাপতির রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক পদগুলি তাঁরা মুখে আবৃত্তি করে দেশে ফিরত। তখন বিদ্যাপতির পদাবলী পূর্ব ভারতের বিশেষ বিশেষ রাজ্যে আঞ্চলিক রূপ লাভ করে। আসাম, উড়িষ্যা ও বাংলাদেশে এভাবে ব্রজবুলির সৃষ্টি। বাংলাদেশে বিদ্যাপতির পদের কোনো মৈথিলী শব্দ পাঠক ও গায়কের কাছে কর্কশ ও দুর্বোধ্য ঠেকে। তাতে কিছু কিছু বাংলা শব্দ ঢুকে পড়ে ও মৈথিলী ব্যাকরণে শিথিলতা দেখা যায়। বিদ্যাপতির মৈথিলী পদ বাংলায় এসে বাঙালির প্রভাবে কিছু কিছু বাংলা ভাষা ও ব্যাকরণগত পরিবর্তনে নতুন রূপ লাভ করে। বিদ্যাপতির পদের রূপান্তরিত এই ব্রজবুলি ভাষা বৈষ্ণব সমাজ ও রসিক পাঠকের কাছে দ্বিতীয় মাতৃভাষা হিসেবে বিশেষ প্রাধান্য পায়। বাঙালির ভাব-জীবনের সঙ্গে বিদ্যাপতির নিবিড় সম্পর্ক স্থাপিত হয়। বাঙালি পাঠক মাত্রই ব্রজবুলির বিদ্যাপতিকে ঘরের মানুষ করে নিয়েছে।

আরো পড়ুন--  বাংলা সাহিত্যে বিদ্যাপতি সমস্যা, Discuss with best unique 3 points

ব্রজবুলি নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। গ্রিয়ার্সন লিখেছেন—

Numbers of imitators sprang up, many of whom wrote in Vidyapati’s name, so that it is now difficult to separate the genuine from the imitators. specially as the former have been altered in the course of ages to suit the Bengali idiom and metre.

তাঁর মতে ব্রজবুলি বাংলাও নয়, মৈথিলীও নয়—বাংলা ও মৈথিলীর মিলিত এক সংকর ভাষা—”a kind of bastard language, neither Bengali nor Maithili.” ডঃ শ্যামাপদ চক্রবর্তীর মতে, ব্রজবুলি মৈথিলী ভাষার অনুকরণ নয়। বাংলাভাষার সঙ্গে মৈথিলীর ক্ষেত্রোপযোগ্য সমীকরণ। এটা ঘটেছে সচেতন প্রয়াসের দ্বারা নয়, মাতৃভাষা বাংলার স্বাভাবিক প্রভাবে। এ সম্পর্কে ভাষাতাত্ত্বিক ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের একটি উক্তি প্রণিধানযোগ্য—

বিদ্যাপতির মৈথিল ভাষায় রচিত গান বাংলায় আইসে। ষোড়শ শতকের শেষ পর্যন্ত বাংলায় মিথিলায় বেশ যোগ ছিল। বাঙালি বিদ্যার্থীরা পড়িতে যাইতেন। মৈথিলি গান বাঙালিদের ভাল লাগায় তাহারা উহা মিথিলায় সংস্কৃতে গাইতেন। কিন্তু মৈথিলের ব্যাকরণ চর্চা করিয়া ঐ গানগুলির ভাষা সম্বন্ধে অবহিত হওয়ায় কাহারও আবশ্যকতা ছিল না। ফলে বাঙালির মুখে অল্পকালের মধ্যে মৈথিলীর বিশুদ্ধি রহিল না, মৈথিলে বাংলার সংমিশ্রণ ঘটিল এবং এই মিশ্র ভাষায় দুই-চারিটি অবহট্ট ও পশ্চিমা হিন্দীর রূপও আসিল। এই সংমিশ্রণে বিদ্যাপতির পদের যে রূপ দাঁড়াইল, তা না মৈথিল না বাংলা। ষোড়শ শতকে বৈষ্ণব প্রভাবে যখন বিদ্যাপতির গানের আদর বাড়িয়া গেল, তখন বাংলাদেশের লোকের কাছে এই মিশ্র ভাষার একটা নামকরণ হইল; ব্রজমণ্ডলীতে শ্রীকৃষ্ণের লীলা লইয়া এই পদ, এইজন্য ইহার নাম হইল ব্রজবুলি। তখন কেহ ইহার মৈথিল রূপের খোঁজ করেন নাই। পশ্চিমা হিন্দীর রূপ-ভেদ ও মধুরা আগ্রা অঞ্চলে প্রচলিত ‘ব্রজভাষা’ হইতে এই ব্রজবুলি হিন্দী নয়, ব্রজভাষাই হিন্দী; ব্রজবুলি প্ৰাকৃত প্রভাবে জাত বাংলার রূপভেদ নয়, ইহা মৈথিলি বাংলায় মিশাইয়া এক অতি সুমধুর সৃষ্ট কৃত্রিম ভাষা।

উপসংহার


ব্রজবুলি ভাষায় মানবহৃদয়ের মধুর কোমল অনুভূতিগুলি সুন্দর ও সাবলীলাভাবে প্রকাশ পেয়েছে। এই ভাষার শ্রুতিমাধুর্য অতুলনীয়। কৃত্রিম ভাষা হলেও ব্রজবুলি ললিত কোমল মধুর বলেই প্রেমানুভূতির মিলন বিরহ ভাব প্রকাশের অন্যতম বাহন। দীর্ঘ তিন শতাব্দী ব্যাপী এই ব্রজবুলি ভাষা অন্যবাহন হিসেবে কাব্য কৌলিন্য অর্জন করেছে। কিন্তু মনে রাখা দরকার, ভাষাতাত্ত্বিক বিবর্তনে ইতিহাসের সক্রিয় সময়েই এর সৃষ্টি সম্ভব হয়েছে। যা কৃত্রিম ভাষা তাকে অনুকরণের দ্বারা দীর্ঘকাল টিকিয়ে রাখা যায় না। যা স্বাভাবিক নয় তার আয়ু ফুরিয়ে যেতে বেশি সময় লাগে না। এক বিশেষ ভাবগত পরিমণ্ডলের মধ্যেই ব্রজবুলির উদ্ভব ও বিস্তার ঘটেছে।

আরো পড়ুন--  অষ্টাদশ শতাব্দীর বৈষ্ণব পদ সংকলন গ্রন্থ

বিদ্যাপতির অনুকরণে সার্থক ব্রজবুলির পদ রচনা করেছেন গোবিন্দ দাস, জ্ঞান দাস ও বলরাম দাস প্রমুখ কবিবৃন্দ । আধুনিককালে ঈশ্বর গুপ্ত ও রবীন্দ্রনাথ ব্রজবুলিতে পদ রচনার প্রয়াস পান। কিন্তু এঁদের ব্রজবুলির ভাষা বৈষ্ণব সাহিত্যের ব্রজবুলির মতো সুললিত নয়। ব্রজবুলি ভাষায় পদ রচনা করলেও রবীন্দ্রনাথ আক্ষেপ করেছেন তিনি সে ভাষায় কৃষ্ণের মধুর বংশীধ্বনি বাজাতে সক্ষম হননি। আসলে ব্রজবুলি ভাষা দুই ভাষার মিশ্র প্রক্রিয়ার সৃষ্টি হলেও ভাষাতাত্ত্বিক বিবর্তনের ক্রান্তি-ক্ষণে বৈষ্ণবীয় ভাব পরিমণ্ডলে তা একান্ত সহজ ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রণোদনা দেয়। কিন্তু পরবর্তীকালে তা কৃত্রিম অনুকরণ-সর্বস্ব ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালে তাতে পূর্বেকার সতেজ প্রাণধর্ম তিরোহিত হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: সংরক্ষিত !!