Menu

কবি সুবন্ধু

কবি সুবন্ধু : গদ্যকাব্য রচয়িতা কবি সুবন্ধুর পরিচয় বিধৃত হলো। তাঁর রচিত বাসবদত্তার সংক্ষিপ্ত পরিচয় সংযুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি কবি মৌলিকত্বও আলোচিত হয়েছে।

কবি সুবন্ধু


কবি সুবন্ধু -র সময়কাল

সুবন্ধুর ‘বাসবদত্তা’ একটি উল্লেখযোগ্য গদ্যকাব্য। সুবন্ধুর বাসবদত্তার প্রশংসা করে বাণভট্ট তাঁর গ্রন্থ “হর্ষচরিতে” বলেছেন— “কবীনামগলদ্দর্পো নূনং বাসবদত্তয়া।” এর থেকে বলা যায়—সুবন্ধু বাণের পূর্ববর্তী। তবুও সুবন্ধুর আবির্ভাব কাল নিয়ে জটিলতা কমে নি। “ন্যায়স্থিতিমিব উদ্যোতকরস্বরূপাং বুদ্ধসঙ্গতিমিবালংকারভূষিতাম্” —সুবন্ধুর এই রচনাংশ থেকে অনেকে অনুমান করেন যে, সুবন্ধু এখানে উদ্যোতকার এবং যষ্ঠ শতকের মধ্যভাগে ধর্মকীর্তি রচিত ‘বুদ্ধসঙ্গতি’ নামক গ্রন্থের উল্লেখ করেছেন। বাসবদত্তার সম্পাদক গ্রে তাই সুবন্ধুকে বাণ ও উদ্যোতকারের অন্তর্বর্তীকালের কবিরূপে চিহ্নিত করেছেন। বাসবদত্তার অপর সম্পাদক R. V. Krishnamachariar-এর মতে সুবন্ধু হলেন বাণের উত্তরসূরী এবং আলংকারিক বামনের পূর্ববর্তী।

অনেকে আবার সুবন্ধুকে বাণের পরবর্তী কবিরূপে প্রমাণ করতে প্রয়াসী হয়েছেন। বাকপতিরাজ তাঁর “গৌড়বহ” নামক প্রাকৃত ঐতিহাসিক কাব্যে (শ্লোক-৮০০) ভাস, কালিদাস এবং হরিচন্দ্রের সঙ্গে সুবন্ধুর উল্লেখ করেছেন। খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকের পূর্বার্ধে এই গ্রন্থটি রচিত। সুতরাং সপ্তম শতকের শেষভাগকে সুবন্ধুর রচনাকালের উত্তরসীমারূপে গ্রহণ করা অসমীচীন নয়।

আরো পড়ুন--  সংস্কৃত গদ্যকাব্য, Prose Romance

কবি সুবন্ধু সম্পর্কে এ বি কীথ

অধ্যাপক কীথ সপ্তম শতাব্দীর মাঝামাঝি কোন সময়কে সুবন্ধুর আবির্ভাবকাল রূপে উল্লেখ করেছেন— ‘Subandhu must be placed in the second quarter of the seventh century and that he was only a contemporary of Bana whose work came to fruition before Bana’s.’

কবি সুবন্ধু -র ব্যাক্তিজীবন

সুবন্ধুর ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে বিশেষ কোন তথ্য পাওয়া যায় না। বাসবদত্তার প্রারম্ভিক পদ্যবন্ধে কবি নিজেকে ‘সুজনৈকবন্ধুঃ’ বলে উল্লেখ করেছেন— “সরস্বতীদত্তবরপ্রসাদশ্চক্রে সুবন্ধুঃ সুজনৈকবন্ধুঃ।” এর থেকে অনেকে অনুমান করেন যে, কবির সুজন নামে এক ভাই ছিলেন। আবার অনেকের মতে সুবন্ধু ছিলেন প্রাকৃত বৈয়াকরণ বররুচির ভাগিনেয়। তবে এসকল মতের কোন ঐতিহাসিক সত্যতা না থাকায় সেগুলি সর্ববাদিসম্মত নয়। এরূপ কিংবদন্তী প্রচলিত আছে যে কবি কাশ্মীর দেশীয় ব্রাহ্মণ ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে কবির জন্মস্থান বা বাসস্থান সম্পর্কে প্রামাণ্য তথ্য দুর্লভ।

কবি সুবন্ধু -র বাসবদত্তা কাব্য

সুবন্ধু রচিত বাসবদত্তা শ্লেষপ্রধান কথা জাতীয় গদ্যকাব্য। রাজা চিন্তামণির পুত্র কন্দর্পকেতু এবং কুসুমপুরাধিপতি শৃঙ্গারশেখরের কন্যা বাসবদত্তার প্রণয়কাহিনী এই কাব্যের প্রধান উপজীব্য বিষয়। সুন্দরী রাজকন্যা বাসবদত্তাকে স্বপ্নে দেখে কন্দর্পকেতু বন্ধু মকরন্দের সঙ্গে তার অন্বেষণে বের হন। বাসবদত্তাও এক অনিন্দ্যসুন্দর রাজকুমারের স্বপ্ন দেখে সখী তমালিকার কাছে তা ব্যক্ত করেন। বিন্ধ্যপর্বতের এক অরণ্যে শুকসারীর কথোপকথন থেকে কন্দর্পকেতু জানতে পারেন যে, বাসবদত্তার পিতা কোন এক বিদ্যাধর-রাজকুমারের হাতে কন্যা সম্প্রদান করবেন।

আরো পড়ুন--  কবি বাণভট্ট, সংস্কৃত সাহিত্যের কবি

একথা শুনে কন্দর্পকেতু বাসবদত্তাকে নিয়ে পলায়ন করেন এবং অরণ্যে রাত্রি অতিবাহিত করেন। সকালে বাসবদত্তা ফলমূল সংগ্রহের জন্য যান। তাঁকে লাভ করার জন্য দুই কিরাতসৈন্য পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে। ঋষির আশ্রমের পবিত্রতা নষ্ট হওয়ায় ঋষি বাসবদত্তাকে অভিশাপ দেন। বাসবদত্তা পাষাণে পরিণত হন। বাসবদত্তাকে না পেয়ে কন্দর্পকেতু আত্মত্যাগে উদ্যত হলে দৈববাণী হয় যে– হারানো প্রিয়ার সঙ্গে তাঁর পুনর্মিলন হবে। কন্দর্পকেতু বনপথে ঘুরতে ঘুরতে প্রেয়সীর অনুরূপ শিলামূর্তি দেখে তা স্পর্শ করা মাত্রই পাষাণী মূর্তি জীবন্ত হয়ে ওঠে। উভয়ের মিলন হয়। সংক্ষেপে এটাই বাসবদত্তার কাহিনী।

কবি সুবন্ধু -র বাসবদত্তা কাব্যের বিশেষত্ব

গ্রন্থের আখ্যানভাগ নগণ্য হলেও কবির রচনার গুণে তা উপভোগ্য হয়ে উঠেছে। রচনার মধ্যে নিহিত আছে কবির বহুশাস্ত্রে পারঙ্গমতার নিদর্শন। কথালাপের ক্ষেত্রেও সরল বাগ্‌ভঙ্গী প্রশংসনীয়। তবে চরিত্রচিত্রণে ও পরিহাস পরিপাটিতে কবির দৈন্য স্পষ্ট। শ্লেষ, বিরোধাভাস অলংকারের বাহুল্য এবং সমাসবদ্ধ পদের সন্নিবেশ অনেক সময় ভাবপ্রতীতির পথে অন্তরায় হয়ে উঠেছে।

আরো পড়ুন--  কবি দণ্ডী, দশকুমারচরিত রচয়িতা

বাসবদত্তার কাহিনীতে চমৎকারিত্ব থাকলেও অভিনবত্ব বিশেষ নেই। অপ্রত্যাশিত ঘটনার যোগাযোগে প্লটের বন্ধন এত শিথিল যে অনেক জায়গায় পাঠকের যুক্তিবুদ্ধি স্তব্ধ হয়ে যায়। রচনার মধ্যে পরিমিতি-বোধেরও অভাব রয়েছে। কন্দর্পকেতু যখন স্বপ্নে রূপসী রাজকন্যাকে দেখতে পান তখন সেই রাজকন্যার রূপবর্ণনা কবি এত দীর্ঘায়িত করেছেন যে পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। সুবন্ধুর রচনায় বাণের গদ্যরীতির পূর্বাভাস পাওয়া যায়। সমাসের জটিল গ্রন্থন এবং সুদীর্ঘ বাক্যরচনা-যা বাণের গদ্যরীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য-তা সুবন্ধুর রচনায় কম নেই। অলঙ্কারের মধ্যে বিশেষ করে অনুপ্রাস, শ্লেষ ও বিরোধাভাসের ব্যবহারে চাতুর্য থাকলেও স্থানে স্থানে অলঙ্কারের অতিব্যবহার মুদ্রাদোষের মত লাগে। কাহিনীর বিন্যাসেও বাণ এবং সুবন্ধু সগোত্র।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: সংরক্ষিত !!