Menu

কবি বিদ্যাপতির ধর্ম | Discuss with best 3 unique points

Last Update : January 12, 2024

বিদ্যাপতিকে অনেকে বলে থাকে তিনি পঞ্চোপাসক। একজন কবির ধর্ম বিষয়ে পাঠকের কৌতূহল থাকবে তা স্বাভাবিক। এখানে বিদ্যাপতির ধর্ম পরিচয় সম্বন্ধে কিছু আলোচনা করা হল।

বিদ্যাপতির ধর্ম

ভূমিকা


বিচিত্র বিষয়কে অবলম্বন করে বিদ্যাপতির কবিপ্রতিভার অভিব্যক্তি ঘটেছে। তিনি হরি, হর, দুর্গা, কালী ও রাম-সীতা বিষয়ে পদাবলী রচনা করেছেন। বাংলাদেশে বিদ্যাপতির জনপ্রিয়তা রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক পদাবলীর জন্য। স্বয়ং মহাপ্রভু বিদ্যাপতির পদ আস্বাদন করতেন (‘চণ্ডীদাস বিদ্যাপতি রায়ের নাটকগীতি’ ইত্যাদি)। সাধারণ বাঙালি, রসিক, সমাজ, বৈষ্ণব ভক্ত ও কবিদের কাছে বিদ্যাপতি পরম ভাগবত, বৈষ্ণব চূড়ামণি, রাধাকৃষ্ণ পদাবলীর ব্যাস ও সহজিয়া মতের নবরসিকদের অন্যতম বলে খ্যাত।

দীর্ঘকাল বিদ্যাপতি বাংলাদেশে বৈষ্ণব কবি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। আধুনিক কালে বিদ্যাপতি সংক্রান্ত গবেষণার ফলে কোনো কোনো বাঙালি পণ্ডিত, মৈথিলী ও হিন্দী পণ্ডিতরা তথ্য সহযোগে প্রমাণ করতে প্রয়াসী হয়েছেন যে বিদ্যাপতি পরমভক্ত শৈব ছিলেন। স্বপক্ষে যুক্তি এই বিদ্যাপতি কৌলিক ঐতিহ্যে শৈব ছিলেন। তাঁর বংশধররা সকলে শৈব ছিলেন। কবি মিথিলার রাজসভার কবি ছিলেন। রাজারা শৈবধর্মাবলম্বী ছিলেন, মিথিলার জনসাধারণ শিবভক্ত। মিথিলার গ্রামে গ্রামে প্রচুর শিবমন্দির আছে। কবি স্ব-গ্রামে একটি শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। নিজে শিবের উপাসনা করতেন। বাহিতপুরে কবির চিতার উপর শিবলিঙ্গ স্থাপিত হয়েছে। সেখানে চৈত্রমাসে মেলা হয়। মৈথিল পণ্ডিতদের মতে মিথিলায় বিদ্যাপতির শিবদুর্গার গান বেশি জনপ্রিয়।

বিদ্যাপতি কোনো কোনো পদে হরিহরের একাত্মতা প্রচার করেছেন। কোথাও শিবকে অধিকতর প্রাধান্য দিয়েছেন। মৈথিলী পণ্ডিতদের মতে বিদ্যাপতির কুলধর্ম ও ব্যক্তিধর্ম শৈব ছিল। রাধাকৃষ্ণের পদাবলী নিছক শৃঙ্গার রসের, সেখানে ধর্মীয় বিশ্বাস বা চেতনা নেই।

আরো পড়ুন--  কবি জ্ঞানদাস, 16শ শতকের কবি

এ সম্পর্কে আমাদের ভিন্ন মন্তব্য এই যে, মিথিলায় বিদ্যাপতির হরগৌরীবিষয়ক পদাবলী বেশি জনপ্রিয় হলে, কবি যে শৈব ছিলেন তা বলা ঠিক নয়। কারণ কোনো বিষয়ে জনপ্রিয়তার দ্বারা কোনো কবির ধর্মবিশ্বাসের নির্ধারণ হয় না। তাছাড়া মিথিলা ও নেপাল থেকে গবেষক পণ্ডিতরা বিদ্যাপতির যে সব পদ সংগ্রহ করেছেন সেগুলির মধ্যে রাধাকৃষ্ণবিষয়ক পদাবলী বেশি, হরগৌরী বিষয়ক পদাবলী নগণ্য। মিথিলায় লোকমুখ থেকে ত্রিশটি রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক পদাবলী সংগৃহীত হয়েছে। এটা রাধাকৃষ্ণ বিষয়ে জনরুচি ও জনপ্রিয়তার পরিচায়ক।

সাহিত্যের রসমূল্যের বিচারে হরগৌরী বিষয়ক বিদ্যাপতির পদাবলী নগণ্য। রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক পদে বিদ্যাপতির কবিপ্রতিভার উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে। সেখানে চিরায়ত মানবমানবীর প্রাণের গভীর আকৃতি ধ্বনিত হয়েছে।

বিদ্যাপতির ধর্ম
ছবি : ইন্টারনেট

বিদ্যাপতির ধর্ম

বিদ্যাপতি স্মার্ত ও পঞ্চোপাসক


মুসলিম আক্রমণে মিথিলার সমাজ ও সাংস্কৃতিক জীবনে ভাঙন ধরে। বিদ্যাপতি বিপন্ন মিথিলার সাংস্কৃতিক জীবনের পুনর্জাগরণ ও পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য শৈব ও শক্তিধর্মের পৌরাণিক আদর্শ তুলে ধরেন। কুলধর্ম ও লোকধর্ম মেনে সেই সমস্ত পদে পৌরাণিক আদর্শের প্রতি কবির ভক্তিমত্তা প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু সেখানে কবিপ্রাণের নিবিড় স্পর্শ নেই। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে, বিদ্যাপতি স্মার্ত ও পঞ্চোপাসক ছিলেন

তিনি পৌরাণিক বিভিন্ন দেব-দেবীর মাহাত্ম্যে আস্থাবান ছিলেন। এটি হল কবির বিদ্যাপতি স্মার্ত ও পঞ্চোপাসক ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাস। কিন্তু কবি যখন লেখনী ধারণ করেন তখন অন্তর্নিহিত প্রেরণা বা ভাব ভাবনার আবেগের কাছে তাঁর ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাস বিলুপ্ত হয়ে যায়। কবির ধর্ম বলে যদি কোনো বস্তু থাকে, তা কবির আন্তরধর্ম। কবি জীবন দ্রষ্টা ও জীবন স্রষ্টা। তিনি জীবনের লীলা বৈচিত্র্যের সাধক। মধুসূদন খ্রীষ্টান ছিলেন, রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্ম ছিলেন, সপ্তদশ শতাব্দীর মুসলমান কবিরা ইসলাম ছিলেন। কিন্তু তারা অল্পবিস্তর হিন্দুর পৌরাণিক ধর্মসংস্কারের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন।

আরো পড়ুন--  শাহ মুহম্মদ সগির এবং ইউসুফ জোলেখা

বিদ্যাপতি বাংলার গোস্বামী সমাজে ধর্মগুরু হিসেবে শ্রদ্ধান্বিত ও পূজিত। কিন্তু বিদ্যাপতি আনুষ্ঠানিক অর্থে বৈষ্ণব ছিলেন না। বিদ্যাপতি রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক পদাবলী রচনা করে লোকচিত্তে চৈতন্য ধর্মের ব্যাপ্তির পথ তৈরী করেন। বিদ্যাপতির হরগৌরী বিষয়ক পদে প্রাণের আর্তি ও কাব্যব্যঞ্জনা নেই। বিদ্যাপতি শৈব, শাক্ত বা গাণপত্য যাই হন না কেন, রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক পদের মধ্যে তাঁর ব্যক্তিগত মনন ও অনুভূতির স্বতঃস্ফূর্ত অভিব্যক্তি ঘটেছে। তিনি আনুষ্ঠানিক ভাবে বৈষ্ণব ছিলেন না, কিন্তু তাঁর কবিসত্তার মধ্যে বৈষ্ণবীয় উপাদান যথেষ্ট ছিল।

প্রকৃতপক্ষে বিদ্যাপতি ছিলেন মানবীয় রসের কবি। প্রেম ও সৌন্দর্যের কবি। তিনি রাজসভার কবি হয়ে শৃঙ্গার রসের পদ রচনায় আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর সৃজনী প্রতিভার ধর্মীয় প্রেরণা থেকে রসপ্রেরণাই সর্বাধিক শীল ছিল। তিনি বৈষ্ণবীয় ঐতিহ্যের নানা পর্যায়ের পদ রচনা করে কাব্যকলার বিস্ময়কর অপূর্ব নিদর্শন রেখে গেছেন। বৈষ্ণব পদ রচনায় বিদ্যাপতি তাঁর কবিপ্রতিভা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিঃশেষে উজাড় করে দিয়েছেন। প্রেম ও সৌন্দর্যানুভূতির বিচিত্র ও গভীর পরিচয় মেলে বিদ্যাপতির বৈষ্ণব পদে।

আরো পড়ুন--  বাংলা সাহিত্যে বিদ্যাপতি সমস্যা | Discuss with best unique 3 points

কবির ধর্ম


আসল কথা, বহু ব্যক্তিত্বের সমন্বয়ে বিদ্যাপতির মনোজীবন গড়ে উঠেছিল। তিনি রাজসেবক, কবি, পৌরাণিক, সংস্কৃতির স্থাপয়িতা ও রঙ্গরসিক। কিন্তু রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক পদাবলীর মধ্যে বিদ্যাপতির কবিপ্রতিভার স্বমহিম্নি আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। বাঙালি বিদ্যাপতিকে রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক পদাবলীর জন্য পরমপ্রিয় করে নিয়েছে। বাংলাদেশে বিদ্যাপতির জনপ্রিয়তা রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক পদাবলীর জন্য। বোধ হয়, সেজন্যই মৈথিলী পণ্ডিতরা ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিদ্যাপতির শৈব ধর্মবিশ্বাস ও হরগৌরী বিষয়ক পদাবলীকে প্রাধান্য দিতে চান। তাঁদের শৈব কবি বিদ্যাপতিকে বাঙালি বৈষ্ণব বানিয়ে আপন ঘরের মানুষ করে নিয়েছে। এ প্রসঙ্গে দীনেশচন্দ্র সেনের উক্তি মনে করা যায়–

বাঙালী বিদ্যাপতির কুর্তা-পাগড়ী খুলিয়া লইয়া ধুতি-চাদর পরাইয়া দিয়াছে।

ঘর ছাড়া বিদ্যাপতিকে তাঁরা মিথিলার মধ্যেই আবদ্ধ করে রাখতে চান। কিন্তু বিচিত্ররসের সাধক বিদ্যাপতি বাঙালির হৃদয়-রাজ্যে যে ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন সেখান থেকে তাঁকে সরিয়ে নেওয়া অসম্ভব। বিদ্যাপতি সবধর্মের ঊর্ধ্বে শাশ্বত জীবনধর্মের কবি, প্রেমের কবি, রূপের কবি, রসের কবি, সর্বধর্মের কবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: সংরক্ষিত !!