Menu

শাহ মুহম্মদ সগির এবং ইউসুফ জোলেখা

শাহ মুহম্মদ সগির এবং ইউসুফ জোলেখা

ভূমিকা

শাহ মুহম্মদ সগির পঞ্চদশ শতকের দ্বিতীয় অর্ধে তাঁর কাব্য রচনা করেন। ইউসুফ জোলেখা বাংলা ইসলামী সাহিত্যের লিখিত কাব্যের মধ্যে সবচেয়ে পুরনো। অনেক প্রাচীন গ্রন্থে এই প্রণয় কাহিনী আছে। কবি ঠিক অনুবাদ করেননি। লোকশ্রুতি থেকে কাহিনী কাঠামোটি সংগ্রহ করে নিজের মতো বদলে নিয়েছেন। নতুন গল্প ও বর্ণনা আছে। পরিবেশ এবং ভাষারীতি বাংলার নিজস্ব। জোলেখা চরিত্রটিও রূপায়ণগুণে সার্থক।

প্রতিষ্ঠা পর্ব থেকেই মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মুসলমান লেখকদের লেখা কাব্য-কবিতা পাওয়া যাচ্ছে। এতদিন পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের গবেষক ও পণ্ডিতদের ধারণা ছিল আরাকান রাজসভার পূর্বেকার কোন মুসলমান কবির বাংলা কাব্য পাওয়া যায়নি, যা লিখিত পুথির মধ্যে দিয়ে আমাদের হাতে পৌঁছেছে। প্রকৃতপক্ষে বিভাগ-পূর্বকালে ড. এনামুল হক এবং আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ প্রচুর পুথি সংকলন করেছিলেন। তার মধ্যে অনেক পুথি মুসলমান কবিদের লেখা। দীনেশচন্দ্র সেন এ বিষয়ে কৌতূহলী ছিলেন, কিন্তু তিনি অনেক কিছু করে যেতে পারেননি। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের পরবর্তী লেখক সুকুমার সেন খুব বড় কাজ করলেও অসম্পূর্ণ কাজ করেছেন। পূর্ববঙ্গে প্রাপ্ত পুথিকে গুরুত্ব না দেওয়ায় বাংলা সাহিত্যের একদিক সম্পর্কে তিনি পাঠকদের অনবহিত রেখেছেন। ফলে পশ্চিমবঙ্গে সাহিত্যের ইতিহাস পাঠ খণ্ডিত থেকে গিয়েছে। পূর্ব পাকিস্তান আমল থেকে বাঙালি গবেষকেরা যাঁদের মধ্যে পূর্বোক্ত দুইজনের সঙ্গে আহমদ শরীফের গবেষণা মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের এক অনুদঘাটিত দিক আমাদের সামনে মেলে ধরেছে। সেকালের বাংলা সাহিত্য যে হিন্দু মুসলমানের মিলিত সাধনার বস্তু এই সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে পঞ্চদশ শতাব্দীতে এমন কবি দেখা দিয়েছেন যিনি শুধু মুখে মুখে কবিতা লিখে গান গেয়ে শ্রোতার কাছে পৌঁছননি, লিখিত আকারে কাব্য রচনা করছেন। মুসলমান কাব্য-পাঠকও যে সেই সময় কিছু সংখ্যক তৈরি হয়ে উঠেছেন, তা বোঝা যায়। মুসলমান সামন্তরা যখন বাংলা মহাভারত কথা শুনতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন (পরাগলী মহাভারত ও ছুটি খানের অশ্বমেধ পর্বের কথা স্মরণ করা যেতে পারে) তখন ইসলামী কিসসা শুনতেও যে উৎসাহী হবেন তা সহজে অনুমান করা যায়।

Image Credit : Wikipedia

কবি-পরিচয়

শাহ মুহম্মদ সগির বাঙালি মুসলমান কবিদের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন, অর্থাৎ তাঁর চেয়ে পুরনো অন্য কোন পুথির খোঁজ পাওয়া যায়নি। শুধু তাই-ই নয়, বাঙালি পুরনো কবিদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান নিরপেক্ষভাবে একজন খুবই প্রাচীন লেখক। সগিরের লেখা বইটি বিচার বিশ্লেষণ করে দেখলে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এর একাধিক গুরুত্ব বোঝা যাবে। সাহিত্যের ইতিহাসের পাঠকেরা এতদিন জানতেন বাংলা রোমান্টিক প্রণয়-আখ্যানের সূচনা আরাকানের রাজসভার কবিদের রচনার মধ্যে দিয়ে, উল্লেখ করার মতো মুসলমান কবি সপ্তদশ শতকের আগে দেখা দেননি।

বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগে আরবি-ফারসি বিষয় নিয়ে কাব্য রচনার আরম্ভ আরাকানের কবিরাই প্রথম করেছিলেন। সগিরের কাব্যটি নিয়ে আলোচনা করার ফলে দেখা যাচ্ছে উল্লিখিত তিনটি ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্যই পঞ্চদশ শতক থেকে তাঁর ‘ইউসুফ জোলেখা’ কাব্যে রয়েছে। এছাড়াও সগিরের এই বড় আকারের কাব্যটি একটি কথা প্রমাণ করে যে বাঙালি মুসলমানেরা তুর্কি-বিজয়ের পরে শ দুয়েক বছরের মধ্যে মাতৃভাষায় ইসলামী প্রসঙ্গ নিয়ে কাব্য লিখবার মতো একটা মানসিক স্থিতিস্থাপকতার স্তরে গিয়ে পৌঁছেছিল।

শিক্ষিত মুসলমান মাতৃভাষার চর্চা করছেন, কাব্য রচনা করছেন, অবশ্যই কোন ধনবান প্রতিপালকও পেয়ে গিয়েছিলেন, নিশ্চয়ই এই কাব্যপাঠের পাঠকও তৈরি ছিল। শিক্ষিত মুসলমান শুধুই আরব পারস্যের দিকে তাকিয়ে থাকত তার সাংস্কৃতিক ক্ষুধা তৃষ্ণা নিবারণের জন্য, এই ধারণার ভ্রান্তি প্রমাণ করে দিল সগিরের এই আখ্যান কাব্যটি। প্রকৃত প্রস্তাবে পঞ্চদশ শতকে বাঙালি হিন্দু এবং মুসলমান দুই ধর্মের মানুষই যথাক্রমে সংস্কৃত এবং আরবি-ফারসির বন্ধন মুক্ত হয়ে বাংলা ভাষার মধ্যে আপনাকে পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করবার পথ পেয়ে গেল। সত্যই এই পর্বটি হয়ে উঠল বাংলা সাহিত্যের প্রতিষ্ঠা কাল।

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে আমরা পূর্ব পরিচিত বর্গগুলির সঙ্গে আরও দুটি বর্গের অস্তিত্ব মেনে নিয়েছি। ইসলামী সাহিত্য এবং প্রণয়-আখ্যান। ইউসুফ জোলেখা একটি ইসলামী কাব্য। যদিও বিষয়-বস্তুর বিচারে একে যদি প্রণয়-আখ্যান শ্রেণীতে ফেলা যায় তাহলেও ভুল করা হয় না।

এই কাব্যটিকে একটি ইসলামী কাব্য বলে অভিহিত করার কারণ হল, এর নায়ক ইউসুফ ইসলামী মতে এক ধর্মপ্রাণ পুরুষ, আল্লাহতালার একজন প্রধান সেবক। এই কাব্যে তাঁর আদর্শ চরিত্র রূপায়িত হয়েছে। কাফেরের ধর্মের উপরে ইসলাম ধর্মের মহিমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই কারণে এই কাব্যটিকে ইসলামী কাব্য বলাই সঙ্গত।

কাব্য পরিচয়

বিখ্যাত গবেষক আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ ইউসুফ জোলেখার পুথি সংগ্রহ করেন। মোট ৫ খানা পাণ্ডুলিপি পাওয়া গিয়েছে, তার মধ্যে তিনখানাই ওঁর সংগৃহীত। কাব্যটি সম্প্রতি ১৯৮৪ সালে ড. মুহম্মদ এনামুল হকের সম্পাদনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয়। সম্পাদনায় এনামূল হকের প্রধান সহযোগী ছিলেন আহমদ শরীফ। ওরা দুজনই নানা যুক্তি তথ্য দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে সগির ছিলেন পঞ্চদশ শতকের মানুষ, সম্ভবত সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের এক কর্মচারী।

কবির লেখা রাজবন্দনার সাহায্যে এরূপ প্রমাণ করা হয়েছে। তা ছাড়া কবির ভাষা দেখে ওঁদের মনে হয়েছে, এই ভাষা শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের ভাষার চেয়ে আধুনিক হলেও শ্রীকৃষ্ণ বিজয়ের ভাষার চেয়ে প্রাচীন। তবে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যটি খুব প্রচলিত না থাকায় এর পুরনো রূপটি রক্ষিত হয়েছে। ইউসুফ জোলেখার ৫টি পুথি পাওয়া গিয়েছে। এতে বোঝা যায়, কাব্যটি অপ্রচলিত ও লুপ্ত হয়ে পড়েনি। তাই এর ভাষার প্রাচীনত্ব অল্পই রক্ষিত হয়েছে। তবুও যতটা রক্ষিত তাতেই বোঝা যায় এর ভাষা শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের কিছু পরবর্তী হলেও শ্রীকৃষ্ণবিজয়ের কিছু আগেকার নিদর্শন

তা সব পাঠাই দেঅ জাউ বৃন্দাবন।।

ইচ্ছুফকে বোলহ জাউক নিধুবনে।

তোহ্মা জথ সখি আছে নৌআলী জৌবন।

তুলিয়া আনৌক পুষ্প তোহ্মার কারণে।।

আমাত্য কুমারি জথ রূপে কামাতুর।

লাস বাস করি জাঁউ বৃন্দাবন পুর।।

জথেক নাগরিপনা কামাকুল রূপে।

ইছুফ ফেলাউ গিয়া যুবুতি আলাপে।।

সম্পাদকেরা পুরনো শব্দের একটি লম্বা ফর্দও তৈরি করেছেন। কারক-বিভক্তির ক্ষেত্রেও এর প্রায় শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের অনুরূপ বৈশিষ্ট্য।

যাঁরা কাব্যটির প্রাচীনত্বের যুক্তি মানতে চান না, তাঁরাও এর অধুনাতন সীমা ষোড়শ শতকের মধ্যেই রেখেছেন। অনেক গবেষকতো শ্রীকৃষ্ণকীর্তনকেও সপ্তদশ শতকের পিছনে রাখতে রাজি নন। আমরা এসব ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য পণ্ডিতদের মত মেনে শ্রীকৃষ্ণকীর্তনকে যেমন পঞ্চদশ শতকে স্থান দিয়েছি তেমনি ইউসুফ জোলেখাকে ঐ শতকেই কিছু পরে রাখতে চাইছি।

কাব্য বৈশিষ্ট্য

ইউসুফ জোলেখার কাহিনী পুরো মৌলিক নয়। মূলত এটি একটি ঐতিহ্যবাহী গল্প। কাব্যগ্রন্থের মৌলিকতার পরিমাণ নির্ণয় করতে গিয়ে ভূমিকায় আহমদ শরীফ বলেছেন, বাইবেলে, কোরাণে, ফিরদৌসির লেখায় এই উপখ্যান আছে। কিন্তু সগির তাদের কারুর সরাসরি অনুসরণ করেননি।

কেউ কারুর নিষ্ঠাবান অনুকারক-অনুসারক নন, তত্ত্বে তথ্যে, বিন্যাসে, ঘটনার ও বর্ণনার সংক্ষেপণে-বিস্তারে সবাই স্ব স্ব পথেই বিচরণ করেছেন। এ থেকে সহজেই বোঝা যাবে এ ধরনের প্রাচীন জনপ্রিয় ও সর্বলোকশ্রুত কাহিনী বা বৃত্তান্ত মুখ থেকে মুখে, কান থেকে কানে, কাল থেকে কালে, স্থান থেকে স্থানে এবং এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে সঞ্চারিত, সঞ্চিত ও পুনরাবৃত্ত হয় বটে।’

পূর্ববর্তী নানা কাহিনী কাঠামোর মিল থাকলেও কাব্যটি অংশত মৌলিক বলে মেনে নেওয়া হয়েছে। কবি ঘটনার মধ্যে কিছু কিছু নতুনত্ব এনছেন। যেমন ইউসুফ পুত্রদের বিয়ে ও রাজ্যভোগ, ইউসুফের দিগ্বিজয়, ভাই ইবন আমীন ও মধুপুর রাজকন্যা বিধপ্রভার প্রণয় কাহিনী। তা ছাড়া বর্ণনা, পরিবেশ রচনা, উপমাদি অলঙ্করণ প্রভৃতিতে মিশর আরবের নয়, বাংলার সামাজিক সাংস্কৃতিক রূপই ধরা পড়েছে। তা ছাড়া ফারসি ইউসুফ জোলেখা কাব্য সুফীতত্ত্বের রূপক। নায়ক নায়িকা পরমাত্মা ও জীবাত্মা। সগিরের কাব্যে এই রূপকের কোনো স্পষ্ট প্রতিফলন নেই। এর প্রণয়-আখ্যানের চেহারাটি অনেক নিটোল।

এই কাব্যের মুখ্য পাত্র ইউসুফ ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি। কিন্তু কবি তাঁকে নিষ্প্রাণ এক ধর্মসাধকরূপে মাত্র অঙ্কিত করেননি। তাঁর পৌরুষ ও ব্যক্তিত্বকে মানবিক মহিমার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁকে শুধুই কামজয়ী পুরুষরূপে দেখান হয়নি, তাঁর বাস্তব বুদ্ধি অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক নিপুণতা বিশেষ দক্ষতার সঙ্গে চিত্রিত হয়েছে। তবে চরিত্র হিসেবে জোলেখা এক কথায় অসাধারণ। পরবর্তীকালে দৌলত কাজি বা আলাওলের কাব্যেও এরূপ রমণী চরিত্রের সাক্ষাৎ মেলে না। তাঁর প্রেম অত্যন্ত সংরাগতপ্ত। কামনা-বাসনায় চঞ্চল এই রমণী তাঁর সামাজিক মর্যাদার কথা ভুলে তীব্র বিহ্বলতায় প্রেমিককে পেতে চেয়েছে এবং যখনই প্রত্যাখ্যাত হয়েছে তখন প্রণয়ীকে প্রবল আক্রোশে আক্রমণ করেছে। নারী-প্রেমের এই উগ্রতা আমাদের সাহিত্যে সুলভ নয়। আবার উত্তরকালে এই উগ্রতা বিগলিত আত্মসমর্পণে একটি বিনম্র পরিণতি লাভ করেছে।

জোলেখা প্রতিমা পূজা পরিত্যাগ করে ইসলাম বরণ করার ফলেই ইউসুফকে লাভ করতে সমর্থ হল, এই প্রসঙ্গটি সমকালীন বঙ্গীয় মুসলমান কবিদের কাছে একটি বিশিষ্ট অভিপ্রায়। হিন্দুদের মুসলমান হবার জন্য এই আহ্বান যুগোচিত— একজন মুসলমান কবির দিক থেকে তো বটেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: সংরক্ষিত !!
close button